চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করনীয়
চোখের পানি শুকিয়ে গেলে কি করনীয় – আমাদের শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো চোখ। এক কথায় বলতে গেলে চোখ আমাদের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো চোখের যত্ন সম্পর্কে ততটা আগ্রহী নয়।
বর্তমানে আমরা মোবাইল ল্যাপটপ অথবা বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ে এতটাই বেশি ব্যস্ত যে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা এসব ডিভাইস ব্যবহার করি অথচ আমাদের চোখের উপর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে তা এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করি না।
মানুষের চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার এটি বর্তমানে অন্যতম একটি কারণ। আজ আমরা আলোচনা করব চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করণীয় কি সে সম্পর্কে বিস্তারিত
(১) অশ্রু কি?
আমরা সকলেই জানি,কাঁদলে আমাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ে। কিন্তু কখনো কি আমরা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখেছি যে আসলে অশ্রু কি ?আমরা যখন কোন কষ্ট পাই তখন আমাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
আরও পড়ুনঃ কিডনি ভালো রাখার উপায়
আবার কোন ছোট বাচ্চার কাছ থেকে চকলেট কেড়ে নিলেও তার চোখ দিয়ে পানি পড়ে। আসলে আমাদের আবেগ,অনুভূতি,কষ্ট সবকিছুর জন্যই আমাদের চোখ দিয়ে যে পানি পরে তাকে মূলত অশ্রু বলা হয় ।
(২) অশ্রু কিভাবে উৎপন্ন হয় ?
আমরা প্রতিটি জিনিস তেমন গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করি না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা খুঁতখুতে স্বভাবের,তারা কিন্তু বসে নেই।তাই তারা চোখের পানি বা অশ্রু কিভাবে উৎপন্ন হয় সেটিও বের করতে ছাড়েনি।
চোখের পানি হল এক ধরনের জটিল মিশ্রণ। যার মধ্যে পানি,তেল, ইলেক্ট্রোলাইট ,লিপোক্যালিন ,সোডিয়াম, পটাশিয়াম , লবণ ইত্যাদি মিশ্রিত থাকে ।
যখন মানুষের আবেগ ,যেমন ব্যথা ও আনন্দ দুটোই অনুভূত হয়, তখন ল্যাক্রিমাল অশ্রু উৎপাদন করে থাকে ।হাসি ও কান্নার কারণে যখন চোখের গ্রন্থিতে চাপ সৃষ্টি হয়,তখন চোখ দিয়ে পানি পড়ে। অশ্রু মূলত ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে ।
(৩) অশ্রুর কাজ কি? । চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করনীয়
উইলিয়াম ফ্রে নামে একজন বিজ্ঞানী 15 বছর আগে চোখের পানি নিয়ে গবেষণা করেছেন। চোখের পানির ও কিছু বিশেষ কাজ রয়েছে যা আমাদের সকলেরই অজানা। অশ্রুর কাজ কি? এ বিষয়ে আমরা জানব। যেমন –

- (১)চোখের পানি মূলত ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে বের হয়ে আসে। এটি আমাদের চোখকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে থাকে।
- (২) চোখের পানি চোখকে পানি শূন্যতা থেকে রক্ষা করে থাকে। যার ফলে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।
- (৩) চোখের পানিতে লাইসোজাইম নামক একটি উপাদান থাকে,যা বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে ।
- (৪)এটি চোখে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং কর্নিয়াকে আর্দ্র রাতে সহায়তা করে ।
- (৫)চোখের পানির সাথে সাথে শরীরের ম্যাঙ্গানিজ বের হয়ে যায় ।যার কারনে শরীর সতেজ ও প্রফুল্ল থাকে ।
(৪) অশ্রু আর অশ্রু সমার্থক শব্দ । চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করনীয়
আমরা সবাই জানি যে অশ্রু অর্থ চোখের পানি ।অশ্রু শব্দটি সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু অশ্রুর আরো কিছু সমার্থক শব্দ রয়েছে যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা।যেমন– নয়ন জল, আঁখিবাড়ি, নেত্র বাড়ি,চোখের জল ও চোখের পানি ইত্যাদি। এসব শব্দের অর্থ হলো অশ্রু।
(৫) চোখের পানি শুকিয়ে গেলে কি হবে ?
চোখের পানি আমাদের চোখকে সুরক্ষা দেয় এবং ভালো রাখে। কিন্তু কোন কারনে চোখের পানি শুকিয়ে গেলে আমাদের নানান ধরনের সমস্যা সম্মুখীন হতে হবে।যেমন
- চোখের পানি কমে গেলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাবে । যার কারণে চোখে জ্বালাপোড়া ভাব অনুভূত হবে ।
- চোখের পানি লুব্রিকেন্ট হিসেবে যথেষ্ট না হলে, চোখে স্পষ্ট দেখা যাবে না। সবকিছুই ঝাপসা অনুভূত হবে।
- চোখে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি না থাকার কারণে চোখে মিউকাসের পরিমাণ বেড়ে যাবে ।
- পানি কমে যাওয়ার কারণে আলোর দিকে তাকানো যাবে না ।
অনেকেরই হয়তো অজানা চোখের পানি শুকিয়ে গেলে কি হবে?চোখে পানি পরিমান কমে গেলে উপরোক্ত সমস্যা গুলো সম্মুখীন হতে হবে।
(৬) চোখ শুকিয়ে যাওয়ার কারন কি?
আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ আমরা এতটাই যান্ত্রিক হয়ে উঠেছি যে, প্রযুক্তি ছাড়া আমরা কোন কাজই করতে পারি না।অনেক সময় দেখা যায় চোখ শুকিয়ে যায়। কিন্তু কখনো কি জানার চেষ্টা করেছি, চোখ শুকিয়ে যাওয়ার কারণ কি?চোখ শুকিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন ধরনের কারণ হতে পারে। যেমন-
- (১) দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন দেখা। এটি একটি অন্যতম কারণ। যার ফলে চোখের পানি শুকিয়ে যায়।
- (২) চোখ শুকিয়ে যাওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে দীর্ঘ সময় এসি তে থাকা ।
- (৩)অতিরিক্ত ঔষধ সেবনের কারণেও চোখের পানি শুকিয়ে যেতে পারে। আর এই সমস্যাটি বিশেষ করে ৫০ বছরে ঊর্ধ্বে যারা তাদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।
- (৪) অতিরিক্ত দূষিত আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে চোখের পানি শুকিয়ে যায়।
উল্লেখিত কারণগুলো চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম ।
(৭) চোখের শুষ্কতা দূর করার উপায় কি ? । চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করনীয়
চোখে শুষ্কতা দেখা দিলে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেয়। তাই চোখের শুষ্কতা দূর করার উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে।যেমন-
- গরম ভাপ নেয়া –কুসুম গরম পানিতে একটি নরম কাপড় ভিজিয়ে এরপর পানি ঝরিয়ে চোখের উপরে বেশ কিছুক্ষণ দিয়ে রাখুন। যতক্ষণ না পর্যন্ত চোখে তেল বেরিয়ে আসে।
- ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা– একটানা যে কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। আর ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলুন। এটি চোখে শুষ্কতা কমাতে সহায়তা করবে ।
- মধু– একটি পাত্রে সামান্য কুসুম গরম পানি নিয়ে তা ঠান্ডা করে, এক চামচ মধু মিশ্রিত কর, নরম কাপড় ভিজিয়ে চোখের ওপর পাঁচ মিনিট দিয়ে রাখুন। এটি চোখকে মসৃণ করতে সাহায্য করবে।
- শসা– শসা পানির একটি অন্যতম উৎস। শসা গোলাকৃতির করে কেটে চোখের উপরে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ রেখে দিন।এটি চোখকে পানি প্রবাহ করে এবং ঠান্ডা রাখে।
- পর্যাপ্ত ঘুম– চোখ ভালো রাখার জন্য ঘুমের কোন বিকল্প নেই। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমালে চোখের শুষ্কতা ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে।
(৮) শুষ্ক চোখে ভাপ নেয়া কি ভালো?
অনেকে দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায় বা জানে না যে, শুষ্ক চোখে ভাব নেয়া কি ভালো না খারাপ।চোখে শুষ্কতা দূর করার ক্ষেত্রে ভাপ নেয়া অন্যতম কার্যকর একটি উপায়। শুষ্ক চোখে কুসুম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে ভাপ নিলে চোখের জ্বালাপোড়া ভাব কমে যায়, লালচে ভাব দূর হয়ে যায়, স্বস্তি বোধ হয়, চোখে পানি প্রবাহিত করে এবং চোখকে মসৃণ রাখতে সহায়তা করে। তাই এক কথায় বলা যায়, শুষ্ক চোখে ভাপ নেওয়া ভালো।
(৯) চোখে শুষ্কতা দূর করার ড্রপ কোনটি?
চোখের শুষ্কতা দূর করার জন্য যেমন ঘরোয়া অনেক উপায় রয়েছে, তেমনি চোখের ব্যবহার করার জন্য ড্রপ ও রয়েছে।চোখে শুষ্কতা দূর করার ড্রপ কোনটি জেনে নিন।
আরও পড়ুনঃ হার্টের রোগীর খাবার তালিকা
শুষ্ক চোখের জন্য যে ড্রপ রয়েছে সেটি হল “যোনাফ্রেশ আই ড্রপ”।উল্লেখিত ড্রপটি চোখে শুষ্কতা জ্বালাপোড়া নিরসনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এই ড্রপ টি মলিন এবং জেল আকারেও পাওয়া যায়। শুষ্ক চোখের জন্য এই ড্রপটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ চোখ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
(১০) চোখ গর্তে চলে গেলে কি করণীয় ?
আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের দেখা যায় চোখ গর্তে চলে গেছে। এর বিভিন্ন কারণ হতে পারে। যেমন– অপর্যাপ্ত ঘুম, দুশ্চিন্তা, শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টির অভাব ইত্যাদি আরো অনেক কারণ। এ সমস্যা দেখা দিলে যা করণীয় তা হল–

- (১) প্রথম শর্ত হল পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা যাবে না। রুটিন করে খাবার খেতে হবে।
- (২) প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য ও পানি পান করতে হবে। চোখের নিচে চর্বির অভাবে অনেক সময় এই সমস্যা দেখা দেয়। তাই খাদ্য এর ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
- (৩) এছাড়াও আলু ও শশা কেটে চোখের উপরে কিছুক্ষণ রেখে দিলে চোখ মসৃণ হয় ও চোখের আশেপাশে কালো দাগ দূর হয়ে যায়। কারণ চোখ গর্তে চলে গেলে চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে যায়।
উপরোক্ত উপায় অবলম্বন করে চোখ গর্তে চলে যাওয়ার সমাধান পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। তবে অনেক সময় এটি বংশগত হয়ে থাকে। যার সমাধান আসলে আমাদের জানা নেই।
(১২) শুষ্ক চোখে লক্ষণ কি?
চোখে শুষ্কতা বোঝার জন্য কিছু উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়। যেমন– যদি আমাদের চোখে জ্বালাপোড়া ভাব মনে হয়, অস্বস্তি বোধ হয়, চোখ চুলকায়, চোখে স্পষ্ট না দেখা , চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ ভার মনে হওয়া ইত্যাদি সমস্যাগুলো মনে হয় ,তবে বুঝতে হবে আমাদের চোখের পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ হচ্ছে না। চোখ শুষ্ক হয়ে গেছে।কারণ চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়ার এগুলো অন্যতম কারণ।
(১৩) চোখের ঘরোয়া চিকিৎসা কি?
চোখের ঘরোয়া চিকিৎসা বলতে আসলে চোখের যত্ন বা পরিচর্যা করাকে বোঝায়। চোখ ভালো রাখার জন্য আমরা সবুজ শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাদ্য আমাদের দৈনিক খাবারে রাখবো। দিনে বেশ কয়েকবার ঠান্ডা পানি দিয়ে ঘন ঘন চোখ ধুয়ে ফেলবো। পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।
আরও পড়ুনঃ স্থায়ীভাবে মুখের দুর্গন্ধ দূর করার উপায়
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা যাবে না। সবুজ গাছপালার দিকে নজর দিব। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যে, সবুজ রং এর দিকে তাকালে চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ে। এক জিনিস থেকে আমরা কখনোই ল্যাপটপ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকবো না।
এ সকল নিয়ম মেনে চললে আশা করা যায় আমাদের চোখ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবে। এভাবে ঘরোয়া ভাবেই আমরা আমাদের চোখের পরিচর্যা করতে পারি।
শেষ কথাঃ চোখের পানি শুকিয়ে গেলে করনীয়
আজকের আমাদের এই আলোচনা থেকে এটি বলা যায় যে, চোখের পানি শুকিয়ে গেলে আমরা বেশি বেশি পানি পান করব ।আমাদের খাবারের তালিকায় ছোট মাছ ,বাদাম,সয়াবিন তেল, ডিম, শাকসবজি ইত্যাদি রাখবো। ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটারে কাজ করতে হলে অ্যান্টি রিফ্লেক্টিভ গ্লাস ব্যবহার করব।
আশা করা যায় আমাদের লেখাটি পড়ে আপনারা অনেক অজানা তথ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এমন আরো অনেক অজানা তথ্য জানতে হলে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন। ধন্যবাদ।